বেড়িয়ে আসছে অনেক চমকপ্রদ তথ্য, অর্থের কাছে অন্ধ ছিলেন পাবনার সেই ওসি ওবাইদুল

স্টাফ রিপোটার:
পাবনায় গণধর্ষণের শিকার গৃহবধূকে থানায় ধর্ষকের সাথে বিয়ে দেওয়ার ঘটনায় ওসি ওবাইদুল হককে প্রত্যাহারের পর তার বিরুদ্ধে বেড়িয়ে আসছে অনেক চমকপ্রদ তথ্য। মাদক ব্যবসায়ী চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের সাথে সাথে যোগসাজসে মামলার নামে থানায় শালিসী বাণিজ্যই ছিল তার প্রধান কাজ। অর্থ বিত্তের মোহে চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা থেকেও আসামীদের নাম বাদ দেওয়া এবং নিরীহ ব্যাক্তিদের মামলায় জড়ানোসহ নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে তার বিরুদ্ধে। একাধিক মামলার আসামীদের থানায় ধরে এনে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিভিন্ন বিশ্বস্থ সূত্রে এ সব অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের সাথে সখ্য গড়ে তাদের মাধ্যমে অর্থ বিত্তের পাহাড় গড়াই ছিল পাবনা সদর থানার প্রত্যাহার হওয়া ওসি ওবাইদুল হকের নেশা। তার প্রশ্রয়ে সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী ও অবৈধ বালু উত্তোলনকারীরা একের পর পর এক অপরাধ করলেও বরাবরই থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। খুন, ধর্ষণ, মাদক কারবার কিংবা যে অপরাধই হোক না কেন সন্ত্রাসীদের মধ্যস্থতায় টাকার বিনিময়ে সব কিছুরই সমাধানদাতা ছিলেন ওসি ওবাইদুল।
রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পাবনার ১৪ টি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকদের নিকট থেকে মাহবুব ও আতিক নামের দুই ব্যক্তির মাধ্যমে ৬০ হাজার টাকা করে মাসোহারা নিতেন ওসি ওবাইদুল। এছাড়াও সদর উপজেলার একটি বালিমহাল নিয়ন্ত্রক ইউপি চেয়ারম্যানের কাছ থেকে প্রতি মাসে দুই লাখ টাকা, মহেন্দ্রপুর এলাকার মাদক ব্যবসায়ী স¤্রাটসহ বিভিন্ন মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা তুলতেন। রাজশাহীর শহরে ওসি ওবাইদুলের দুটি প্রাসাদপ্রম অট্টালিকা রয়েছে। সম্প্রতি, ২৬ লাখ টাকা দিয়ে পরিবারের ব্যবহারের জন্য একটি প্রাইভেট কারও কিনেছেন। তিনি ৮৪ হাজার টাকা দামের হাতঘড়ি, ৪২ হাজার টাকা মূল্যের চশমার ফ্রেমও ব্যবহার করেন। ব্যক্তিগত স্মার্টনেস এর দম্ভ করতে এসব নিয়ে প্রকাশ্যে বাহাদুরীও দেখাতেন তিনি।
পাবনা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ রাসেল আলী মাসুদ বলেন, ওসি ওবাইদুল হক সম্প্রতি পাবনার ভাঁড়ারা ইউনিয়নের চাঞ্চল্যকর জাসদ নেতা লস্কর খানসহ ডাবল মার্ডার মামলার অন্যতম প্রধান আসামীকে ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে এজাহার থেকে নাম বাদ দিয়েছেন। বিষয়টি পাবনায় ‘ওপেন সিক্রেট’ হলেও কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায়নি। আওয়ামী লীগ নেতা রাসেল আলী মাসুদ আরও জানান, কারণে অকারণে ওসি আমাদের সাথেও চরম খারাপ আচরণ করতেন। তিনি আরো বলেন, চরঘোষপুরে চাঞ্চল্যকর রফিকুল ইসলাম রফি মন্ডল হত্যা মামলার বাদীর ভাই কামরুল ইসলামের নিকট থেকে ৪ লাখ টাকা নিয়ে মামলা নথিভুক্ত করেন।
এ ছাড়া পাবনা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি দৈনিক ‘সংবাদ’ এর পাবনাস্থ স্টাফ রিপোর্টার প্রবীণ সাংবাদিক হাবিবুর রহমান স্বপন জানান, “সারাদেশে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলাকালীন সময়ে পুলিশের গাফিলতি আর ওসির মাদক কারবারীদের সাথে সখ্যতা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় ২০১৮ সালের ১৩ অক্টোবর আমার উপর সন্ত্রাসীরা হামলা চালানো হয়। হামলার আগে সাঁিথয়া উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি (পিতা-আব্দুল জলিল) আমার বাড়ীতে গিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে খবর না লিখতে আমাকে হুমকি দেয়। এর পরেও খবর প্রকাশ করায় ১৩ অক্টোবর রাতে আমার উপর সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। ঘটনার সিসি টিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের নিকট থেকে প্রাপ্ত তথ্যে ঘটনায় সাঁথিয়া উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম নামের ঐ ব্যাক্তির সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হয়ে ওসি ওবাইদুল হকের নিকট বার বার অভিযোগ করি। ওসি আমার অভিযোগের তোয়াক্কা না করে ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে দেয়।”
সম্প্রতি থানায় বিয়ের ঘটনায় ওসি বেকায়দায় পড়লে তাকে বাঁচাতে শফি আবারও সক্রিয় হয় এবং গণমাধ্যমকর্মীদের মোবাইলে ফোন করে ওসির বিরুদ্ধে নিউজ না করতে তদবীর করতে থাকে এবং এক পর্যায় ওসির পক্ষ নিয়ে সাংবাদিকদের হুমকি দেয়। এতেই প্রতীয়মান হয় যে, অপরাধীদের সাথে ওসির কতোটা সখ্য রয়েছে। এ ছাড়া অন্তত এক ডজন চিহিৃত সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী ওসিকে বাঁচতে ফেসবুকসহ বিভিন্ন স্থানে নানা অপতৎপরতা চালায় এবং সাংবাদিকদের নানাভাবে হুমকি দেয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, চলতি বছরের আগস্ট মাসে পৌর এলাকার পাটকিয়াবাড়ি থেকে কাইল্লা শাহিন নামের এক চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীকে একাধিক মাদক মামলায় গ্রেফতার করা হয়। পরে তাকে আদালতে প্রেরণ না করে মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে ছেড়ে দেয় এই ওসি। তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অসংখ্য অভিযোগ ছিল।
এ ছাড়া মানুষের দৃষ্টি এড়াতে ওসি ওবাইদুল হক থানা কম্পাউন্ডে মসজিদের উন্নয়ন করেন। এই মসজিদ উন্নয়নে থানাপাড়া এলাকার কায়কোবাদ মাণিক নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে ওসি ঐ এলাকার অধিকাংশ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অংকের চাঁদা সংগ্রহ করেন। এই মসজিদ সংস্কারে কতিপয় ব্যাক্তির টাকায় সংস্কার কাজ করলেও বাকি অর্থ তিনি আত্মসাৎ করেন।
এদিকে গত বছরের ২৮ আগস্ট রাতে পাবনার নারী সাংবাদিক সুর্বণা আক্তার নদীকে তার বাড়ীর সামনে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এই মামলাটিও ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে ওসি ওবাইদুল। এই মামলার প্রধান আসামী শিল্পপতি আবুল হোসেনের কাছ থেকে ৪২ হাজার টাকার একটি এলইডি টিভি এবং ১লাখ ৪০ হাজার টাকা দামের শোপা সেট নেন। থানার বিভিন্ন এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী, হত্যা মামলার আসামী ও মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে সখ্যতার সম্পর্ক ছিল ওসি ওবাইদুল হকের। এসব সন্ত্রাসীরা নিয়মিত তাদের ফেসবুক পেইজে ওসির সাথে আন্তরিক মূহুর্তের ছবিও পোস্ট করতেন। থানায় বিয়ের ঘটনায় ওসি বেকায়দায় পড়লে তারা ওসিকে নির্দোষ দাবি করে ফেসবুকে পোস্ট দেয়। অনেকে গণমাধ্যমকর্মীদের ফোন দিয়ে ভয়ভীতিও প্রদর্শন করে।
এ ব্যাপারে পাবনার পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম পিপিএম সাংবাদিকদের বলেন, এসব অপকর্মের বিষয়ে বেশ কয়েকটি কমিটি তদন্ত করছে। ওসি ওবাইদুলের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলমান। আপাতত তাকে পুলিশ লাইনের রিজার্ভ অফিসে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তদন্ত রির্পোট পাওয়ার পর বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নকশী টিভি'র সকল অনুষ্ঠান সরাসরি দেখতে ক্লিক করুনঃ সরাসরি সম্প্রচার

ইউটিউবে নকশী টিভির জনপ্রিয় সব নাটক দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন নকশী টিভির ইউটিউব চ্যানেল

মন্তব্য যোগ করুন

Your email address will not be published.

সাম্প্রতিক খবর