রাষ্ট্রের টাকায় ধনীর হজ, নিজের খরচে আবার হজ করতে হবে?

বাংলাদেশে হজের জন্য সরকারি বরাদ্দ থাকে৷ এই সুবিধা নেয় সরকারি মালি থেকে আমলা, আইনপ্রণেতা থেকে স্থানীয় নেতা৷ ধনবানের হজের দায় কেন রাষ্ট্রের কাঁধে?

গ্রামে বন্যা৷ শহরে ডেঙ্গু৷ এই হচ্ছে আজকের বাংলাদেশ৷ এগুলোই আলোচ্য বেশি ঢাকার অনলাইন সমাজমাধ্যমে৷ তবে হালে যে হজযাত্রা, তা-ও কমবেশি আসছে আলোচনায়৷ তাতে হজ নয়, হজযাত্রা করেছেন এমন কয়েকজনকে নিয়েই আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে৷ কেননা নিজেদের আর্থিক সক্ষমতা থাকলেও তারা হজে যাচ্ছেন রাষ্ট্রীয় কোষাগারের টাকায়৷ এদের মধ্যে আছেন নেতা, আলেম, গায়েন, সাংবাদিক- এমন নানা কিসিমের মানুষ৷ এদের কেউ বাম, কেউবা দক্ষিণপন্থী৷ কিন্তু সবাই কী ধর্মপ্রাণ? কেননা এই বদ্বীপে জনতার করের টাকায় হজে যাওয়ার প্রথম শর্তই হচ্ছে, যার সুপারিশেই সুযোগ পান না কেন, ‘ধর্মপ্রাণ’ হতেই হবে৷

ফেসবুক বার্তায় বিষয়টির অবতারণা করেছেন ঢাকার সাংবাদিক মাসুদ কামাল৷ এবার সুযোগ পাওয়া ১০ সাংবাদিকের তালিকা তুলে ধরে তিনি লিখেছেন, ‘‘এঁদের কয়েকজনকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি৷ এরা যে এতটা ‘ধর্মপ্রাণ’ সেটা আগে বুঝতে পারিনি৷”

সঙ্গীতশিল্পী ফকির আলমগীর, কবি আসলাম সানী আছেন সরকারি খরচে হজের কোটায়৷ তাদের ‘ধর্মপ্রাণ’ তালিকায় দেখার বিষয়টি মুমিন বান্দাদের খুশি করতে পারে৷ কিন্তু তাদের কী নিজ খরচে হজ করার মতো সামর্থ্য নেই? তবে সরকারি গাড়িচালক, মালি, পরিবেশন ও পরিচ্ছন্নকর্মীর তালিকায় নিজেদের উঠাতে পেলে দুই কবি-গায়েন নিজেদের সাম্যবাদী দাবি করতেই পারেন৷

তবে ধর্মপ্রাণরাও এবার বড় সুযোগ পেয়েছেন৷ তবে তারা ‘ধর্মপ্রাণ’ ৩৫৭ জনের তালিকার বাইরেই আছেন৷ সরকারি খরচে হজ পালনের জন্য ৫৭ সদস্যের আলেম-ওলামার তালিকা আছে আলাদা হিসেবে৷ কেননা তারা হজযাত্রীদের পরামর্শকের দায়িত্বও পেয়েছেন৷ তাদের বেশিরভাগই নাকি সরকারি দলের একদার শত্রু হালের মিত্র হেফাজতে ইসলামের নেতা৷ এরমধ্যে আলোচিত এক নাম হচ্ছে হেফাজত-প্রধান আল্লামা শফী-পুত্র মাওলানা আনাস মাদানী৷

হজের সুবিধা নিতে চান এবং দিতে চান মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সংসদীয় কমিটির সভাপতি, সাংসদ, সিইসি থেকে শুরু করে প্রায় সবাই৷ এবার তাই সরকারি খরচে হজযাত্রী, পর্যবেক্ষক, পরামর্শক, পথ-প্রদর্শক, সেবক- নানা কিছু মিলিয়ে বহরটা নাকি হয়ে যাবে সাড়ে আটশত মানুষের৷ এতে জনগণের করের কতো টাকা খরচ হবে? এ প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো উত্তর আপাতত মিলছে না৷ তবে ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল- এই চার বছরে সরকারি খরচে ৯৯৯ জনকে হজ করাতে সরকারের খরচ হয়েছিল ২৪৫ কোটি টাকা৷ এবার হজ করছেন ৩৫৭ জন৷ আরও শ-পাঁচেক মানুষ হজ করার পাশাপাশি দায়িত্ব ভাতাও পাবেন৷ তাহলে হজের খরচ ও ভাতা মিলিয়ে অঙ্কটা চলে যাচ্ছে বহুদূর৷ মিলিয়ন থেকে বিলিয়নে৷

হজ সামর্থ্যবান মুসলমানদের অবশ্য কর্তব্য এক ধর্মাচার৷ রাষ্ট্রধর্ম বহাল থাকা বাংলাদেশে সরকারি খরচেও হজে পাঠানোর সুযোগ আছে৷ এটা অবশ্য স্বাধীনতার পর থেকেই চলছে, ছিলো পাকিস্তান আমলেও৷ তবু জনগণের করের পয়সায় হজে পাঠানোর বিষয়টি ধর্ম কতটা অনুমোদন দেয়- জানতে চাইলে বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির যুগ্ম মহাসচিব মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী বলেন, ‘‘কোনো রাষ্ট্র বা সরকার চাইলে কোনো ব্যক্তিকে হজে পাঠাতে পারে৷ সেক্ষেত্রে তারা বিশেষ তহবিল ব্যবহার করে থাকে৷ রাষ্ট্রের স্বার্থে, জণগণের কল্যাণে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে থাকে৷ বিভিন্ন গুণীজনকে বিভিন্নভাবে সম্মানিত করে থাকে৷ এক্ষেত্রে অর্থায়ন করা হলে, তাতে দোষের কিছু নেই৷ এটি বৈধ, এটি জায়েজ৷’’

কিন্তু সামর্থ্যবানরা হয়েও তো সরকারি খরচের সুযোগ নিচ্ছে অনেকেই৷ এ প্রসঙ্গে আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজমের এই সহকারী অধ্যাপক বলেন, ‘সামর্থ্যবান কেউ্ও যদি যায়, তবে তার হজও আদায় হবে৷’

নিজের খরচে তাকে আবার হজ করতে হবে?

‘দ্বিতীয়বার হজ করা লাগবে না৷’ এমন বিধানের কথাই বললেন শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী৷ রীতি থেকেই নীতি!

বছর বছর হজ ও ওমরাহ নীতি প্রকাশিত হয় বাংলাদেশে৷ রাষ্ট্রীয় খরচে হজ পালনের সুযোগের কথা তাতেই তুলে ধরা হয়ে৷ এবার নীতিমালার নয় দশমিক পাঁচ ধারায় বলা হয়েছে, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী/উপমন্ত্রী অথবা সরকার কর্তৃক মনোনীত একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে সরকার ঘোষিত সর্বনিম্ন প্যাকেজমূল্যে সরকারি অর্থে পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব প্রেরণ করা যাবে৷’

বাস্তবেই রাষ্ট্রপ্রধান আর সরকারপ্রধানের দপ্তর থেকেই আসে প্রধান তালিকাটা জানালেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনিছুর রহমান৷ বাকিরা সুযোগ পায় এই মন্ত্রণালয়ের হাত ধরে৷ তারা কারা? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এরমধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা থাকেন৷ থাকেন বিশিষ্ট আলেম-ওলামা৷ থাকতে পারেন ইমাম আর মুয়াজ্জিনরা৷ আবার অসচ্ছল ব্যক্তিবর্গ যারা ছোটখাট চাকরি-বাকরি করে এমন মানুষরাও সুযোগ পান৷

অসচ্ছলরা কী আসলেই সামর্থ্যহীন, জানতে চাইলে ধর্ম-সচিব দাবি করেন, আবেদন পাওয়ার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) মাধ্যমে যাচাই করা হয়৷ তারপরই হয় তালিকাভূক্তি৷

তালিকায় রাজনৈতিক পদ-পদবি সবসময়ই ছিলো: আনিছুর জাতীয় পর্যায়ের পরিচিত মুখ, যাদের নিজের খরচে হজ করার সামর্থ্য আছে তারাও সরকারি খরচে হজযাত্রা করতে পারছেন? এ প্রসঙ্গে মো. আনিছুর রহমান বলেন, হয়তো দেশের জন্য তাদের অবদান, তাদের কর্ম বিবেচনা করা হয়ে থাকে৷

দেশের সাংবাদিকদের কেউ কেউ এবার হজযাত্রার তালিকায় এসেছেন, প্রসঙ্গটি টানতেই ধর্ম-সচিব বললেন, শুধু এবার নয় গতবারও ১০-১২ জন সাংবাদিক একই সুবিধা পেয়েছেন৷ এবার পেয়েছেন ১০ জন৷

এই তালিকা কীভাবে হয়েছে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিএফইউজে, ডিইউজের আপনাদের সাংবাদিক নেতারাই তালিকা করেছেন৷ তালিকার সবাইকে আমি চিনিও না জানিও না৷ দু-একজনকে হয়তো চিনি৷’

হজ করতে ব্যাকুল থাকলেও শুধুই অর্থাভাবে যারা হজ করতে পারেন না, তারা অগ্রাধিকার পাবে কবে? এ প্রসঙ্গে অবশ্য আশার বাণী তুলে ধরলেন মো. আনিছুর রহমান৷ তার ভাষায়, ‘‘মাননীয় প্রতিমন্ত্রীও বলেছেন, সত্যিকার অর্থে যারা প্রতিনিধিত্ব করে তাদের তালিকায় নেয়া হবে৷’’

এবারের তালিকা ঘেঁটে দেখা গেছে, সরকারি খরচের হজযাত্রীদের বড় একটা অংশেরই বাড়ি গোপালাগঞ্জ৷ শুধু ওই জেলা নয়, অন্য কিছু জেলার সুযোগপ্রাপ্ত সরকারি দল বা জোটের স্থানীয় নেতা৷ বিষয়টি সম্পর্কে ভালোই জানেন ধর্ম-সচিব৷ তাই কোনো ভনিতা না করেই তার জবাব, ‘‘এ তালিকায় রাজনৈতিক পদ-পদবি সবসময়ই ছিলো৷ রাজনৈতিক দলীয় সরকারের সময় কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা হবে না, এটা আশা করা যায় না৷’’ বিশেষ জেলার বিশেষ সুবিধার বিষয়টিও প্রকাশ্য যে ঘটনা, তা তার কথা থেকেই আঁচ করা গেল৷ কেননা তিনি বললেন, ‘জেলার বিষয়টি আগেও ছিলো৷ এখনো আছে৷ এটা নতুন কিছু নয়৷ যার যার এলাকার প্রতি তার তার দায়িত্ব- কর্তব্য থাকে৷’ বর্তমান ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আব্দুল্লাহর জন্মস্থান গোপালগঞ্জ৷ তার দায়িত্ব-কর্তব্যের ব্যাপার কী এখানে এলো? নাকি বিষয়টি শুধুই কাকতাল? ধর্ম-সচিবের সঙ্গে মুঠোফোনালাপ অবশ্য এতোদূর আর গড়াতে পারেনি৷ বহু বছর ধরে এসবই রীতি, আর সেই রীতিমতোই নীতিও প্রণীত হয়ে থাকে, এটা অবশ্য স্পষ্ট৷ সূত্র: ডয়চে ভেলে

নকশী টিভি'র সকল অনুষ্ঠান সরাসরি দেখতে ক্লিক করুনঃ সরাসরি সম্প্রচার

ইউটিউবে নকশী টিভির জনপ্রিয় সব নাটক দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন নকশী টিভির ইউটিউব চ্যানেল

মন্তব্য যোগ করুন

Your email address will not be published.

সাম্প্রতিক খবর